মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

  ২২ এপ্রিল ২০২১, ১৪:২১

চিকিৎসা ছাড়াই প্রাণ গেলো ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সাগরের

চিকিৎসা ছাড়াই প্রাণ গেলো ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সাগরের
প্রাণ গেলো ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু সাগরের

ভ্যানচালক বাবার ৫ বছর বয়সী ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর অর্থাভাবে চিকিৎসা ছাড়াই অবশেষে প্রাণ গেলো। নিহত শিশু সাগর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের নাদিরাবাদ-বাচ্চামারী গ্রামের ভ্যানচালক মো. বাবলুর ছেলে। বুধবার (২১ এপ্রিল) সকালে নিজ বাড়িতে প্রাণ যায় শিশুটির।

প্রায় দুই দশক ধরে ভ্যান চালিয়ে ৫ সদস্যের পরিবার চালায় বাবলু। গত ৪ মাস আগে থেকে ৫ বছর ৪ মাস বয়সী ছেলে মো. সাগর আলী ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত সাগর নাদিরাবাদ-বাচ্চামারী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণীতে পড়তো।

নিজের পরিবার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা করা পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। তাই শিশু সাগরের বিছানায় পড়ে প্রতিনিয়ত করে চলা আহাজারিতে পরিবারের সকল সদস্যরা ছেলেটির মৃত্যুর প্রহর গুনছিলো গত ৪ মাস ধরে। মৃত্যুর আগেই শিশু সাগর চিকিৎসাভাবে হারিয়েছিলো নিজের দুটি চোখ। দিনরাত ২৪ ঘন্টা ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলো সাগর। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে শিশুটিকে দেখতে প্রতিদিন ভীড় জমাতো প্রতিবেশীরা। তাদের দেয়া বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা দিয়েই চলছে অসহায় বাবা বাবলুর পরিবার।

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর বাবা ভ্যানচালক বাবলু বলেন, আড়াই বছর আগে ছেলের শরীর ফুলতে শুরু করে। চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করালে ডাক্তাররা জানায়, কিডনীর সমস্যা হয়েছে। পরে ওষুধ খেয়ে সেটি ঠিক হয়ে যায়, শিশু সাগর আবারো খেলাধূলা করতে পারে এবং স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু গত ৩ মাস আগে হঠাৎ করে ডানদিকের চোখ ফুলে যায়। স্থানীয় চিকিৎসকদের থেকে ওষুধ নিয়ে এসে খাওয়ালেও কোন উন্নতি হয়নি।

এর দুই দিনের মাথায় চোখ আরো ফুলে যায় এবং নাক-কান দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। সেদিনই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করালে ডাক্তাররা জানান ছেলের ক্যান্সার হয়েছে।

বাবলু আরো বলেন, ডাক্তারা বলেছিলেন, ছেলেকে বাসায় নিয়ে যাও এবং যা খেতে চাই তাই খেতে দাও। বাড়িতেই যাও, আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখে নিয়ে থাকো। মন মানে না, তাই আবারো একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে টেস্ট করালাম। সেখানেও বললো, ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসা করাতে মোটা অঙ্কের টাকা লাগতো। বাসায় এসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার ঘুরেছি, আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু সহযোগিতা করেনি।

সাগরের মা নাসিমা বেগম ক্রন্দনরত অবস্থায় জানায়, গত ৩ মাস থেকে ছেলে সারাদিন-সারারাত ব্যথায় কাঁদছিলো। কোনকিছুই খেতে পারছিলো না। আমরা গরিব মানুষ, ঠিকমতো চূলায় হাড়ি উঠে না। ছেলে যে কয়েকদিন বাঁচলো, তাও ভালো খাবার করে দিতে পারিনি।

প্রতিবেশী লাকি বেগম, মোসফেরা বেগম ও হালিমা বেগম বলেন, আমাদের চোখের সামনেই সবকিছু হতে দেখেছি। সুস্থ একটি ছেলে এভাবে দীর্ঘদিন ধরে মৃতুশয্যায় পড়ে ছিলো। প্রথমে একটু চোখ ফুলে গেছিলো, এ থেকে ধীরে ধীরে প্রতিদিন আকার আরো বেড়েছে। ছেলেটার কষ্ট দেখে তার মা বাবা, প্রতিবেশী সকলেই অঝোরে কেঁদেছে। সারারাত পাশের বাড়ি থেকেও তাদের কান্নার শব্দ পাওয়া যেতো। এখন ক্যান্সার হলে তার চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু তারা তো ঠিকমতো খেতেই পায় না, তাহলে কিভাবে চিকিৎসা করাতো। সরকার, সমাজের বিত্তবান বা সকলেই একটু অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করলে ছেলেটি জীবনটা ফিরে পেতো।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ'র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. গোলাম রাব্বানী বলেন, ব্লাড ক্যান্সারের প্রভাবে তার দুটো নষ্ট হয়েছিলো। চক্ষু, ক্যান্সার ও ইন্টারনাল মেডিসিন ৩ বিশেষজ্ঞ দলের সমন্বয় করে চিকিৎসা করলে ফলপ্রসূ রেজাল্ট পাওয়া যেতে পারতো। বাচ্চাটির চিকিৎসা সম্ভব ছিলো, তবে এটি অনেক ব্যয়বহুল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে করতে হতো।

সকলের সহযোগিতায় একজন বাবা-মা ফিরে পেতে পেতে পারতো তার আদরের ছোট্ট শিশুটিকে। শিশুটির চিকিৎসায় এগিয়ে আসতে পারতো সকলেই।

প্রাণ,ক্যান্সার
আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • আলোচিত